ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হয়েছেন। রোববার (১ মার্চ) ইরানের বার্তা সংস্থা তাসনিম ও ফার্স নিউজ এজেন্সির বরাতে আল জাজিরার প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়।
ইরানে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির মৃত্যুর পর ১৯৮৯ সালে দেশটির সর্বোচ্চ নেতা হন আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি (৮৬)। সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে ইরানের রাজনৈতিক, সামরিক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর তার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ। এছাড়া তিনি দেশের অভ্যন্তরীণ নীতি এবং পররাষ্ট্র নীতি নির্ধারণ করেন।

১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর ইরানে সর্বোচ্চ নেতার পদটি তৈরি করা হয় এবং তা সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এর মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট ও পার্লামেন্টের ওপরে একজন শীর্ষ ধর্মীয় নেতাকে নিরঙ্কুশ ক্ষমতা দেওয়া হয়। ৮৮ সদস্যের আলেমদের নিয়ে গঠিত ‘অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস’ আনুষ্ঠানিকভাবে এই নেতা নির্বাচন করে।
খামেনির ক্ষমতার অন্যতম ভিত্তি ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) ও বাসিজ আধাসামরিক বাহিনী। বিশ্লেষকদের মতে, এই দুই নিরাপত্তা কাঠামোর আনুগত্য তার অবস্থানকে দৃঢ় করে রেখেছে।
খামেনি দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, ইরান কখনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না এবং তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি কেবল বেসামরিক উদ্দেশ্যে পরিচালিত হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা কিংবা জাতিসংঘের পারমাণবিক তদারকি সংস্থাও এখন পর্যন্ত ইরানের পারমাণবিক বোমা তৈরির চেষ্টার কোনো অকাট্য প্রমাণ পায়নি। তবে ইসরাইল এবং যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক মহল দীর্ঘদিন ধরে ভিন্ন দাবি করে আসছে।
ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ নেতারা অতীতে খামেনিকে নিয়ে কঠোর মন্তব্য করেছেন। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইঙ্গিত দিয়েছেন, ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বকে সরিয়ে দিলে দীর্ঘদিনের সংঘাতের অবসান হতে পারে। ইসরাইলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরাইল কাটজ বলেছিলেন, ‘খামেনি এভাবে টিকে থাকতে পারেন না।’
তার ভাষায়, ‘খামেনির মতো একজন স্বৈরশাসক, যিনি ইসরাইল ধ্বংসের লক্ষ্য নিয়ে একটি রাষ্ট্রের নেতৃত্ব দিচ্ছেন- তার অস্তিত্ব অব্যাহত থাকতে পারে না।’
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও একাধিকবার খামেনিকে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। সম্প্রতি তিনি বলেছেন, ইরানের জনগণ চাইলে সরকার পরিবর্তন সম্ভব এবং সেটিই ‘সেরা পরিণতি’ হতে পারে। অতীতে তিনি খামেনিকে ‘সহজ লক্ষ্যবস্তু’ বলেও মন্তব্য করেছিলেন।
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক হামলার লক্ষ্য হতে পারে ইরানের রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বকে দুর্বল করা। কৌশলগতভাবে শীর্ষ নেতৃত্বকে বিচ্ছিন্ন বা অকার্যকর করা গেলে রাষ্ট্রযন্ত্রে অস্থিরতা তৈরি হতে পারে—এমন ধারণা থেকেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়ে থাকতে পারে।
যেভাবে খামেনির অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে হত্যার আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের মধ্যে ঘনিষ্ঠ গোয়েন্দা তথ্য আদান–প্রদান হয়েছিল। অভিযান সম্পর্কে জানেন এমন একাধিক ব্যক্তির বরাত দিয়ে এ কথা জানিয়েছে নিউ ইয়র্ক টাইমস।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যখন ইরানে হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছিল, ঠিক তার আগে সিআইএ বেশ গুরুত্বপূর্ণ একটি তথ্য পায়। মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাটি কয়েক মাস ধরে আয়াতুল্লাহ খামেনির অবস্থান ও চলাফেরার ওপর নজর রেখেছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তারা তার অবস্থান ও গতিবিধি সম্পর্কে আরও নিশ্চিত তথ্য সংগ্রহ করে তারা।
প্রতিবেদন অনুসারে, সিআইএর কাছে তথ্য আসে যে, শনিবার সকালে তেহরানের কেন্দ্রস্থলে একটি কমপ্লেক্সে ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের বৈঠক হবে। সেই বৈঠকে উপস্থিত থাকবেন খামেনিও। এমন তথ্য সিআইএ’র হাতে আসার পর হামলার সময় পরিবর্তন করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, নতুন এই গোয়েন্দা তথ্য কাজে লাগানোর জন্যই হামলার সময় পরিবর্তন করা হয়।
সিআইএ’র প্রাপ্ত তথ্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য বড় একটি সুযোগ তৈরি করে দেয়। কারণ তারা বলে আসছিল যে, ইরানের শীর্ষ ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের পরিবর্তনই তাদের লক্ষ্য। তারা মনে করে, প্রাপ্ত তথ্যের ফলে দ্রুত বড় ধরনের সাফল্য পাওয়া যাবে। ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সরিয়ে দেওয়া এবং সর্বোচ্চ নেতাকে হত্যা করা সম্ভব হবে।
বিভিন্ন সূত্রের বরাত দিয়ে গণমাধ্যমটি জানায়, খামেনির অবস্থান সম্পর্কে ইসরাইলকে ‘খুবই নির্ভুল’ তথ্য দেয় সিআইএ। তবে সংবেদনশীল সামরিক ও গোয়েন্দা বিষয় হওয়ায় নাম প্রকাশ করতে রাজি হননি ওই কর্মকর্তা।
মার্কিন গণমাধ্যমটি জানিয়েছে, প্রথমে রাতের অন্ধকারে হামলার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু শনিবার সকালে ওই কমপ্লেক্সে বৈঠকের তথ্য পাওয়ার পর হামলার সময় পরিবর্তন করা হয়। বৈঠকটি হওয়ার কথা ছিল এমন এক কমপ্লেক্সে, যেখানে ইরানের প্রেসিডেন্ট, সর্বোচ্চ নেতা এবং জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের কার্যালয় রয়েছে।
মার্কিন ও ইসরাইলি গোয়েন্দাদের ধারণা ছিল, বৈঠকে ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) প্রধান কমান্ডার মোহাম্মদ পাকপুর, প্রতিরক্ষামন্ত্রী আজিজ নাসিরজাদেহ, মিলিটারি কাউন্সিলের প্রধান অ্যাডমিরাল আলী শামখানি, আইআরজিসির অ্যারোস্পেস ফোর্সের কমান্ডার সাইয়্যেদ মাজিদ মুসাভি, উপগোয়েন্দামন্ত্রী মোহাম্মদ শিরাজি এবং আরও কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা উপস্থিত থাকবেন।
খবরে বলা হয়েছে, প্রাপ্ত গোয়েন্দা তথ্যের আলোকে পরিবর্তিত সময় অনুযায়ী, ইসরাইলের সময় অনুসারে ভোর ৬টার দিকে অভিযান শুরু হয়। তখন যুদ্ধবিমানগুলো ঘাঁটি থেকে উড্ডয়ন করে। বিমানসংখ্যা কম হলেও সেগুলোতে ছিল দীর্ঘপাল্লার ও অত্যন্ত নির্ভুল নিশানায় আঘাত হানতে পারে এমন ক্ষেপণাস্ত্র। উড্ডয়নের দুই ঘণ্টা পাঁচ মিনিট পর তেহরান সময় সকাল ৯টা ৪০ মিনিটের দিকে ক্ষেপণাস্ত্রগুলো কমপ্লেক্সে আঘাত হানে। হামলার সময় কমপ্লেক্সের একটি ভবনে জাতীয় নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট শীর্ষ কর্মকর্তারা ছিলেন। খামেনি ছিলেন পাশের আরেকটি ভবনে।
সিআইএ’র প্রাপ্ত তথ্য সঠিক এবং সে অনুযায়ী ইসরাইল ও মার্কিন বাহিনীর হামলা যে নিখুঁত ছিল সেটা অল্প সময়ের মধ্যেই প্রমাণ হয়ে গেছে। হামলার পর পরই ইসরাইলের পক্ষ থেকে দাবি করা হয় যে, খামেনিসহ শীর্ষ নেতারা নিহত হয়েছেন। তবে তাৎক্ষণিকভাবে ইসরাইলের দাবির ব্যাপারে নিশ্চিত তথ্য কেউ দিতে পারছিল না। ইরানের পক্ষ থেকেও একাধিকবার বলা হয়, সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা খামেনি জীবিত ও সুস্থ আছেন। তবে পরবর্তীতে তেহরান খামেনিসহ কয়েকজন শীর্ষ নেতা ও সামরিক কর্মকর্তার শাহাদাতের কথা স্বীকার করে।