জুলাই অভ্যুত্থানের সময় পুলিশের যেসব আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলাবারুদ লুট হয়েছিল, দেড় বছরেও সেগুলো পুরোপুরিভাবে উদ্ধার করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। এক হাজারেরও বেশি আগ্নেয়াস্ত্র এবং দুই লাখের বেশি গোলাবারুদের কোনো হদিস পাওয়া যায়নি এখন পর্যন্ত।
লুট হওয়া এসব অস্ত্র-গোলাবারুদ উদ্ধারে গত ১৭ মাসে দফায় দফায় বিশেষ অভিযান পরিচালনা করেছে সেনা-পুলিশের সমন্বয়ে গঠিত যৌথবাহিনী। এমনকি লুণ্ঠিত অস্ত্রের সন্ধান পেতে পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত পুরস্কারও ঘোষণা করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। কিন্তু এতসব তোড়জোড়ের পরও অস্ত্র উদ্ধারে মেলেনি আশানুরূপ সফলতা। হাতবদল হয়ে অনেক অস্ত্র অপরাধীদের কাছে চলে গেছে বলেও জানা যাচ্ছে, যা ব্যবহার হচ্ছে ছিনতাই, ডাকাতি, চাঁদাবাজি, এমনকি মানুষ হত্যার মতো অপরাধ কাজে।
এ অবস্থায় আসন্ন সংসদ নির্বাচনের আগে এসব অস্ত্র-গোলাবারুদ উদ্ধার না হলে বড় ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের প্রেসিডেন্ট অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল আ ন ম মুনীরুজ্জামানের ভাষ্য অনুযায়ী, লুট হওয়া অস্ত্রগুলো গত দেড় বছরে পুরোপুরি উদ্ধার হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু, অন্তর্বর্তী সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীগুলো সেটা করতে ব্যর্থ হয়েছে। ভোটের আগে অস্ত্রগুলো উদ্ধার না হলে সুষ্ঠু নির্বাচন করা কঠিন হতে পারে।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলন চলাকালে বিতর্কিত ভূমিকার কারণে পুলিশের ওপর সাধারণ মানুষের ব্যাপক ক্ষোভ জন্ম নেয়। এরই ধারাবাহিকতায় ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটার পর ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সাড়ে চারশোর বেশি থানা ও পুলিশ ফাঁড়িতে হামলা ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। একইসঙ্গে, গণভবন থেকে স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্সের (এসএসএফ) অস্ত্রশস্ত্রও লুট হয়।
হামলাকারীরা তখন সবমিলিয়ে প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার আগ্নেয়াস্ত্র এবং সাড়ে ছয় লাখের মতো গোলাবারুদ লুট করে নিয়ে গেছে বলে প্রাথমিকভাবে জানিয়েছিল পুলিশ।
তবে, সম্প্রতি প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকের সময় সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান জানান, গণ অভ্যুত্থানের সময় লুট হওয়া আগ্নেয়াস্ত্রের প্রকৃত সংখ্যা ছিল তিন হাজার ৬১৯টি। আর গোলাবারুদ লুট হয়েছিল চার লাখ ৫৬ হাজার ৪১৮ রাউন্ড।
লুট হওয়া আগ্নেয়াস্ত্রের মধ্যে চায়নিজ রাইফেলসহ বিভিন্ন ধরনের বন্দুক, সাব মেশিনগান (এসএমজি), লাইট মেশিনগান (এলএমজি), পিস্তল, শটগান, গ্যাসগানসহ আরও বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র ছিল বলে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়। লুট হওয়া এসব অস্ত্র ও গুলি উদ্ধারে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে বিশেষ অভিযান শুরু করে সেনা-পুলিশের সময়ন্বয়ে গঠিত যৌথবাহিনী।
গত দেড় বছরে দফায় দফায় চলা অভিযানে দুই হাজার ২৫৯টি অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানান সেনাপ্রধান, যা লুট হওয়া অস্ত্রের প্রায় ৬২ দশমিক চার শতাংশ। এছাড়া, প্রায় দুই লাখ ৩৭ হাজার ১০০ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়েছে, যা লুটকৃত গোলাবারুদের প্রায় ৫২ শতাংশ।
বাকি অস্ত্র উদ্ধারে গত জানুয়ারিতে পুরস্কারও ঘোষণা করেছে সরকার। এর মধ্যে এলএমজির সন্ধান দেওয়ার জন্য পাঁচ লাখ, এসএমজির জন্য দেড় লাখ এবং চায়নিজ রাইফেলের জন্য এক লাখ টাকা করে পুরষ্কার দেওয়ার ঘোষণা করা হয়েছে। এছাড়া, পিস্তল ও শটগানের জন্য ৫০ হাজার টাকা এবং প্রতি রাউন্ড গুলির সন্ধানের জন্য ৫০০ টাকা করে দেওয়া হবে বলে জানায় সরকার।
এদিকে থানা থেকে পুলিশের যেসব অস্ত্র ও গুলি লুট হয়েছিল, সেগুলোর মধ্যে অনেক অস্ত্র ও গুলি গত দেড় বছরে ছিনতাই, ডাকাতি, চাঁদাবাজি, এমনকি মানুষ হত্যার মতো অপরাধ কাজেও ব্যবহার হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এর মধ্যে গত বছরের এপ্রিল মাসে চাঁদাবাজির অভিযোগে খুলনা থেকে আটক দুই ব্যক্তির কাছ থেকে পুলিশের ব্যবহৃত দুটি পিস্তল, একটি শটগান এবং বেশকিছু গুলি উদ্ধার করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
পুলিশের পক্ষ থেকে তখন জানানো হয়েছিল যে, আটক ব্যক্তিরা লুটের ওইসব অস্ত্র ও গুলি চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে ব্যবহার করে আসছিল।
এ ঘটনার কয়েক মাসের মধ্যে চট্টগ্রামে থেকেও লুটের বেশকিছু অস্ত্র ও গুলি উদ্ধার করে পুলিশ। সেগুলোও ছিনতাই ও ডাকাতির কাজে ব্যবহৃত হচ্ছিল বলে জানানো হয়।
এছাড়া, ২০২৪ সালের নভেম্বরে মুন্সিগঞ্জের শ্রীনগর উপজেলায় শাহিদা আক্তার নামের এক নারীকে গুলি করে হত্যা করা হয়। শ্রীনগর উপজেলার দোগাছি এলাকার এক্সপ্রেসওয়ের সার্ভিস লেন থেকে মরদেহটি উদ্ধার কর পুলিশ। তদন্তে কর্মকর্তারা জানতে পারেন যে, ঢাকার ওয়ারী থানা থেকে লুট করা পিস্তল দিয়ে হত্যাকাণ্ডটি ঘটানো হয়েছে। পরে হত্যাকারীকে গ্রেপ্তার করে সেই পিস্তল উদ্ধার করে পুলিশ।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল আ ন ম মুনীরুজ্জামান বলেন, লুটের যেসব অস্ত্র সাধারণ অপরাধীদের হাতে পড়েছে, তারাই ছিনতাই-ডাকাতির মতো ঘটনায় সেগুলো ব্যবহার করছে। কিন্তু আরেকটি বড় উদ্বেগের জায়গা হলো, অনেক অস্ত্র হাত বদল হয়ে উগ্র গোষ্ঠীগুলোর কাছেও চলে যেতে পারে। আর সেটি ঘটলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বড় ধরনের ঝুঁকির মধ্যে পড়বে।
একই সুরে পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) নুরুল হুদা বলেন, খোয়া যাওয়া অস্ত্র সব সময়ই নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণ হয়ে থাকে। সেগুলো কাদের হাতে পড়েছে এবং তারা কী উদ্দেশ্যে সেটার ব্যবহার করতে চাচ্ছে, সে বিষয়ে নিশ্চিত করে কিছু বলা সম্ভব না।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর লুট হওয়া অস্ত্রের বড় একটা অংশ এখন পর্যন্ত উদ্ধার না হওয়ায় অতীতের নির্বাচনগুলোর তুলানায় এবারের সংসদ নির্বাচনে নিরাপত্তা নিয়ে বাড়তি উদ্বেগ রয়েছে বলে অভিমত নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের। নিরাপত্তা বিশ্লেষক অবসরপ্রাপ্ত মেজর এমদাদুল ইসলামের মতে, এই বাড়তি উদ্বেগের একটা বড় কারণ হলো পুলিশ বাহিনীর দুর্বল অবস্থান। সাধারণ মানুষ এখনও তাদের ওপর পুরোপুরি ভরসা রাখতে পারছেন না।
জুলাই গণ অভ্যুত্থানে বিতর্কিত ভূমিকার কারণে পুলিশের সদস্যরা অনেক জায়গায় হামলা ও হত্যার শিকার হন। এ অবস্থায় একদিকে বাহিনীর শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ে, সেইসঙ্গে পুলিশের সদস্যরাও নৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েন। অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা নেওয়ার পর পুলিশকে মাঠে ফেরানো গেলেও গত দেড় বছরে বাহিনীটি পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি, যার ফলে নির্বাচনের নিরাপত্তা ঝুঁকিতে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক অবসরপ্রাপ্ত মেজর এমদাদুল ইসলাম বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে আহ্বান জানানোর পরও লুটের অস্ত্র ও গুলির বড় একটা অংশ জমা পড়েনি। কাজেই এটা পরিষ্কার যে, যাদের কাছে অস্ত্রগুলো রয়েছে, তারা সেগুলো ভালো কোনো উদ্দেশ্যে রাখেনি। সুযোগ পেলেই তারা অস্ত্রগুলোকে অসৎ উদ্দেশ্যে ব্যবহার করবে। এক্ষেত্রে নির্বাচনের মৌসুমকে তারা সুযোগ হিসেবে দেখতে পারে।
ইতোমধ্যেই একাধিক প্রার্থীর ওপর হামলার ঘটনা ঘটতে দেখা গেছে। এর মধ্যে গত ডিসেম্বরে গুলি করে হত্যা করা হয় ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্যপ্রার্থী ও ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদিকে।
এমন পরিস্থিতিতে সরকারের পক্ষ থেকে গুরুত্বপূর্ণ অনেক প্রার্থীর নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়েছে। বহু প্রার্থীকে দেওয়া হয়েছে অস্ত্র রাখার লাইসেন্স। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, যারা লাইসেন্স পাচ্ছেন তাদের অনেকেই অস্ত্র ঠিকমত ব্যবহারও করতে জানেন না। ফলে, সেটা অন্য কারো হাতে চলে যেতে পারে। সেটার চেয়ে বড় কথা, নির্বাচনের সময় একজন প্রার্থীর হাতে অস্ত্র তুলে দেওয়ার অর্থ হলো প্রতিপক্ষের ওপর তাকে এক ধরনের প্রভাব বিস্তারের সুযোগ করে দেওয়া। এটা ভালো কোনো আলামত নয় বলে অভিমত নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের।
অন্তর্বর্তী সরকারের গত দেড় বছরের শাসনামলে একের পর এক গোলাগুলি ও হত্যার ঘটনা ঘটতে দেখা গেছে। মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের হিসাবে, গত ১৭ মাসে গোলাগুলির বিভিন্ন ঘটনায় কমপক্ষে ২২ জন নিহত এবং ১৩৭ জন আহত হয়েছেন।
এসব ঘটনায় নিয়ে ভোটারদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ড. আব্দুল আলীম বলেন, নির্বাচনের সময়েও যদি মানুষের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ থেকে যায়, তাহলে তারা ভোটকেন্দ্র যাওয়ার ব্যাপারে কতটা আগ্রহ দেখাবেন, সেটা একটা বড় প্রশ্ন।
এ ব্যাপারে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী সম্প্রতি সাংবাদিকদের জানান, লুটের অস্ত্র যাতে নির্বাচনকালে ব্যবহার না হয়, সেটি নিশ্চিত করা হচ্ছে। তিনি বলেন, যে অস্ত্রগুলো লুট হয়ে গেছে আমাদের থানা থেকে, ওই অস্ত্রে কিছু এখনও উদ্ধার করা সম্ভব হয় নাই। কিন্তু, এই অস্ত্রগুলো নির্বাচনের সময় এরা ব্যবহার করতে পারবে না। এই প্রতিশ্রুতি আমি আপনাদের দিতে পারি।