রাজধানীতে জ্বালানি তেল সরবরাহ পরিস্থিতি এখনও স্বাভাবিক হয়নি। সরকারের পক্ষ থেকে সংকট নিরসনের আশ্বাস দিয়ে রেশনিং পদ্ধতি তুলে দেওয়া হলেও বিভিন্ন এলাকায় পেট্রোল পাম্পে সরবরাহ ঘাটতি ও দীর্ঘ লাইনের কারণে ভোগান্তিতে পড়ছেন সাধারণ ভোক্তারা।
গতকাল বুধবার দুপুরে খিলক্ষেত, এয়ারপোর্ট, উত্তরা, আজমপুর, মহাখালী, বিজয় সরণি, মগবাজারসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, প্রায় অর্ধেক ফিলিং স্টেশন জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ রেখেছে।
যেসব পাম্প জ্বালানি সরবরাহ চালু রেখেছে, সেখানেও দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে এক থেকে দুই ঘণ্টা অপেক্ষা করে জ্বালানি নিতে হচ্ছে গাড়ির মালিক ও চালকদের। বিশেষ করে আজমপুর, এয়ারপোর্ট, মগবাজার ও মহাখালীর কয়েকটি পাম্পে অকটেন সরবরাহ সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে।
ভুক্তভোগী চালকদের অভিযোগ, কিছু কিছু পাম্পে জ্বালানি পাওয়া যাচ্ছে না। আবার কিছু পাম্পে প্রয়োজন অনুযায়ী জ্বালানি পাওয়া গেলেও লাইনে অপেক্ষা করাই এখন বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। জ্বালানি পেতে হলে সময় ব্যয় হচ্ছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। ভাটারার বাসা থেকে রাজধানীর বিভিন্ন পাম্প ঘুরে অকটেন না পেয়ে মোটরবাইক চালক ফয়সাল করিম জ্বালানি না নিয়েই বাসায় ফিরে গেছেন।
তিনি আমার দেশকে বলেন, খিলক্ষেত গেলাম তেলের জন্য, সেখানে দীর্ঘ লাইন। এরপর গেলাম এয়ারপোর্টে, সেখানেও সরবরাহ বন্ধ। সেখান থেকে উত্তরার আজমপুর গেলাম, সেখানেও সরবরাহ নেই। পরে আবার মহাখালী এসকে টাওয়ারের সামনে পাম্পে গেলাম, সেখানেও নেই। মগবাজার পাম্পেও পাইনি। বিজয় সরণি এসে ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশনে দেখলাম তেল দিচ্ছে। কিন্তু সেখানেও দীর্ঘ লাইন দেখে ফিরে এলাম। প্রায় দুই ঘণ্টা রাস্তায় রাস্তায় ঘুরলাম; কিন্তু তেল পেলাম না। এখন শেষমেশ খোলা তেল নেব ১৬০ টাকা লিটারেÑযা পরিমাণে কম, দামেও বেশি।
ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশনে সিরিয়ালে থাকা মোটরসাইকেল চালক সৌরভ বলেন, দুপুর ৩টা থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে আছি। এখনো আমার সামনের অনেকে সিরিয়ালে আছেন। অন্তত আরো এক ঘণ্টা লাগবে।
পুরান ঢাকা থেকে ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশনে আসা তৌহিদুল ইসলাম তাজিম আমার দেশকে বলেন, বন্ধুরা জানিয়েছে এলাকায় তেল পাওয়ায় যাচ্ছে না। তাই সরাসরি এখানে এসে লাইনে দাঁড়িয়েছি। এক ঘণ্টা ধরে অপেক্ষা করছি, আরো ঘণ্টাখানেক লাগবে হয়তো তেল পেতে।
একই স্টেশনে সিরিয়ালে দাঁড়ানো বসুন্ধরা এলাকার বাসিন্দা মাহমুদুল ইসলাম এই প্রতিবেদককে বলেন, আমার এলাকায় রাতে অকটেন পাওয়া যায়; তবে দিনের বেলায় না পাওয়ায় বিজয় সরণিতে এসে লাইনে দাঁড়িয়েছি। বাড্ডা থেকে আসা আব্দুল আজিজ মাহিরও দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার কথা জানান। তিনি বলেন, আমার এলাকার পাম্পগুলোতে ঠিকভাবে তেল পাওয়া যাচ্ছে না, সেজন্য এখানে এলাম। দীর্ঘ সময় ধরে লাইনে আছি। দুই ঘণ্টা পর তেল পেলাম। ঈদের আগ মুহূর্তে এসে এসব ভোগান্তি মেনে নেওয়ার মতো নয়।
তেলের লাইনে অপেক্ষারত অনেকে বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ও অতিরঞ্জিত তথ্যের কারণে হঠাৎ করে পাম্পগুলোতে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়েছে। অকটেনের সিরিয়ালে দাঁড়ানো বসুন্ধরার বাসিন্দা রাফি আমার দেশকে বলেন, অনেকেই অপ্রয়োজনেও ট্যাংক পূর্ণ করে নেওয়ায় পরিস্থিতি জটিল হয়ে পড়েছে। মিডিয়া হাইপ ক্রিয়েট করায় এবং উল্টোপাল্টা রিপোর্ট ও ব্লগের কারণে পাম্পে মানুষ হুমড়ি খেয়ে পড়ছে। সবাই যদি একসঙ্গে ট্যাংক ভরে তেল নিতে চায়, তাহলে তো পাম্পে ঝামেলা হবেই। সে সঙ্গে পাম্পের তেল দ্রুত শেষ হবেই। এসব কাজ দ্রুত বন্ধ করা উচিত।
প্রাইভেটকার চালক আব্দুল জাব্বার জানান, প্রায় দুই ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে তিনি তিন হাজার টাকার অকটেন সংগ্রহ করেছেন। একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানান চালক সুমন মৃধাও। তিনি ট্যাংক পূর্ণ করতে পেরেছেন, তবে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে। এতে গুরুত্বপূর্ণ সময় অযথা নষ্ট হয়েছে বলে জানান তিনি।
এদিকে পেট্রোল পাম্প মালিকরা বলছেন, ঈদ সামনে রেখে দূরপাল্লার বাসগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে জ্বালানি সরবরাহ করা হচ্ছে। ফলে ব্যক্তিগত যানবাহনের মালিকরা তুলনামূলক কম জ্বালানি পাচ্ছেন। তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) কর্মকর্তাদের অসহযোগিতার কারণে পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা যাচ্ছে না, যদিও তারা আগাম অর্থ পরিশোধ করেছেন।
চলমান সংকটের বিষয়ে পেট্রোল পাম্প মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম ডিলার্স এজেন্ট পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সৈয়দ সাজ্জাদ করিম কাবুল আমার দেশকে বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে পুরো বিশ্বেই জ্বালানি খাতে অস্থিরতা চলছে। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। এ সমস্যার কার্যকরী সমাধানে বিপিসি ও মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। এখন যে সমস্যাটা চলছে, তিনি সেটার জন্য বিপিসিকে পুরোপুরি দায়ী করেন। তিনি বলেন, সরকার বেশ কয়েকটি পদক্ষেপ নিয়েছে। এগুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করলে সমস্যা থাকার কথা নয়। বিপিসি কর্মকর্তাদের মন্তব্য ও বক্তব্যের কারণেই গ্রাহকদের মধ্যে গুজব ছড়িয়ে পড়েছে।
সারা দেশে কতটি পাম্প বন্ধ রয়েছে এমন প্রশ্নের জবাবে সাজ্জাদ করিম কাবুল বলেন, এর সঠিক পরিসংখ্যান আমাদের কাছে নেই। তবে প্রত্যেক জেলা থেকেই পাম্প বন্ধ থাকার খবর পাচ্ছি। কোথাও কোথাও সীমিত আকারে দেওয়া হচ্ছে। শিগগিরি পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
এ বিষয়ে জানতে বিপিসি চেয়ারম্যান রেজানুর রহমানের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। বিপিসির অপর এক কর্মকর্তা আমার দেশকে বলেন, আমাদের মজুত যথেষ্ট ভালো। কোনো সংকট নেই। যুদ্ধের কারণে আতঙ্কিত হয়ে গ্রাহকদের অতিরিক্ত জ্বালানি নেওয়ার প্রবণতা থেকেই কিছুটা সমস্যা তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন, আমাদের প্রয়োজনীয় পেট্রোলের শতভাগ দেশে উৎপাদন হয়। অকটেনের ৫০ শতাংশ দেশে উৎপাদন হয়। বাকিটা আমদানি করা হয়। ডিজেল নিয়েও তেমন সমস্যা নেই উল্লেখ করে ওই কর্মকর্তা জানান, দেশে বর্তমানে প্রায় আড়াই লাখ টন ডিজেল মজুত আছে। এর বাইরে আরো নতুন জাহাজ আসতে থাকবে। কেউ অতিরিক্ত মজুত না করলে সংকট তৈরির কোনো আশঙ্কা নেই বলেও জানান তিনি।
চলমান মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে সরকার টানা কয়েক দিন জ্বালানি বিপণনের ক্ষেত্রে রেশনিং পদ্ধতি প্রয়োগ করে। পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ায় রোববার থেকে তা প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। পাশাপাশি জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফেরাতে সরকার কয়েকটি বিশেষ নির্দেশনাও জারি করে।
জ্বালানি বিপণন ও সরবরাহের ক্ষেত্রে রেশনিং পদ্ধতি প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত গত রোববার সাংবাদিকদের বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটতে পারেÑএমন আশঙ্কা থেকে জ্বালানি সরবরাহে রেশনিং পদ্ধতি আরোপ করা হয়েছে। এখন আমাদের মজুত স্বাভাবিক রয়েছে। কোনো সংকট নেই। মানুষের ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন ও সেচ মৌসুমে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরকার এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী।
তিনি বলেন, সরকারের জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর কোনো ইচ্ছা নেই। পুরো বিশ্বে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হলেও আমরা জনগণের স্বার্থ বিবেচনা করে দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেইনি।
এর আগে জ্বালানি মন্ত্রণালয় সারা দেশে জ্বালানি তেল সরবরাহ ও বিপণনব্যবস্থায় শৃঙ্খলা বজায় রাখতে জেলা প্রশাসকদের বিশেষ তদারকের নির্দেশ দেওয়া হয়। নির্দেশে ডিপোর মজুত যাচাই, পাম্পে সরবরাহ নিশ্চিতকরণ, অবৈধ মজুত ও পাচার রোধ এবং অতিরিক্ত দামে বিক্রি ঠেকাতে কঠোর নজরদারি ও শাস্তির ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের এমন নির্দেশনার পরও মাঠপর্যায়ে এর তেমন কোনো প্রভাব পড়েনি বলে জানান পেট্রোল পাম্প মালিক সমিতির সভাপতি সাজ্জাদ করিম কাবুল। তিনি বলেন, সরকারের নির্দেশনা বাস্তবায়নে সমন্বয়ের অভাব রয়েছে।