শুক্রবার, ২৯ আগস্ট ২০২৫
শুক্রবার, ২৯ আগস্ট ২০২৫
✔ বাংলা টেক্সট কনভার্টার
শিরোনাম
advertisement
সিলেট বিভাগ

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বিলুপ্তিতে সিলেটের অর্থনীতিতে কী প্রভাব পড়বে?

বাংলাদেশে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গত ১৩ মে রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) বিলুপ্ত ঘোষণা করে দুটি পৃথক বিভাগ—রাজস্ব নীতি বিভাগ ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগ—গঠন করেছে। সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, কর নীতি ও প্রশাসনকে আলাদা করে রাজস্ব ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও দক্ষতা বাড়ানোই এই পুনর্গঠনের উদ্দেশ্য।

এনবিআর বাতিল হওয়ার পর রাজস্ব নীতি বিভাগ মূলত কর আইন প্রণয়ন, কর হার নির্ধারণ, এবং আন্তর্জাতিক চুক্তি পরিচালনার দায়িত্ব পালন করবে। অন্যদিকে রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগ দায়িত্ব নেবে কর আদায়, নিরীক্ষা, অনিয়ম প্রতিরোধ এবং কর পরিশোধ ব্যবস্থার আধুনিকীকরণে।

অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ গণমাধ্যমে বলেছেন, ‘বিশ্বের সব দেশেই রাজস্ব নীতি ও বাস্তবায়ন বিভাগ পৃথক। যাঁরা নীতি প্রণয়ন করবেন, তাঁদের পেশাদার হতে হবে; অর্থাৎ দেশের জিডিপি, অর্থনীতি, পরিসংখ্যান-এসব বিষয়ে ধারণা থাকতে হবে। যাঁরা নীতি প্রণয়ন করবেন, তাঁরা আবার রাজস্ব সংগ্রহও করবেন, তা হতে পারে না।’

তবে, এই প্রশাসনিক পুনর্গঠনের ফলে সিলেট বিভাগের অর্থনীতিতে কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে, তা নিয়ে সংশয় ও আলোচনা তৈরি হয়েছে।

সিলেট বিভাগের অর্থনৈতিক ভিত্তি মূলত প্রবাসী আয়, চা শিল্প, পর্যটন, এবং হাওরাঞ্চলের কৃষি ও মৎস্য খাত। রাজস্ব কাঠামোর এই বড় পরিবর্তনের ফলে এসব খাতে সরাসরি বা পরোক্ষ প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। আবার অনেকে বলছেন বিষয়টি যেহেতু একেবারে অভিনব, সেক্ষেত্রে কী পরিবর্তন আসে, তার জন্য অপেক্ষা করাই শ্রেয়।

প্রতিবছর সিলেটে প্রায় ২৫ লাখ পর্যটক আসেন—জাফলং, বিছনাকান্দি, লালাখাল, মাধবকুণ্ডের মতো গন্তব্যে। যদি পর্যটন খাতের ওপর অতিরিক্ত কর বসানো হয়, তাহলে তা এই খাত সংশ্লিষ্ট ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য বোঝা হয়ে উঠতে পারে। অন্যদিকে, রাজস্ব নীতি বিভাগ পর্যটন খাতকে ‘কর সুবিধাপ্রাপ্ত খাত’ হিসেবে স্বীকৃতি দিলে এই খাত বিকাশ পেতে পারে।

পর্যটন গবেষক ও শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক আব্দুল হামিদ বলেন, ‘সরকার রাজস্ব বিভাগ বিলুপ্ত করে দুইটা বিভক্ত করেছে, ভাল উদ্যোগ কিন্তু আমি জানি না সরকার কতটুকু কি ধরে রাখতে পারবে।‌‌’

তিনি বলেন, ‘২০২৬ সালে আমরা যখন উন্নয়নশীল দেশে অন্তর্ভূক্ত হবো, তখন সরকার তার আয়ের উৎস বাড়াতে পর্যটনের মতো খাতেই হাত দিবে। তাছাড়া অন্য খাতগুলোতে কর যথেষ্ট বেড়ে গেছে, সেখানে সুযোগ কম।’

রাজস্ব নীতি বিভাগ পর্যটন খাতকে ‘কর সুবিধাপ্রাপ্ত খাত’ হিসেবে স্বীকৃতি দিলে এই খাত বিকাশ পেতে পারে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কর সুবিধা বিভিন্ন ক্ষেত্রে বা খাতেই দেওয়া হয়, কিন্তু এর বেনিফিটটা আসলে ভোক্তার পকেটে যায় না। এই বেনিফিটটা ব্যবসায়ীরা নেয়, সিন্ডিকেট নেয়। তবে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে পারলে ক্ষেত্র বিশেষে এ খাত বিকশিত হবে।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, সিলেট বিভাগ থেকে প্রতি বছর প্রায় আড়াই বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা ৩০ হাজার কোটি টাকার সমপরিমাণ রেমিট্যান্স আসে। যদি ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠানো সহজ হয় ও প্রণোদনা অব্যাহত থাকে, তাহলে আয় বাড়তে পারে।

তবে কর প্রশাসনের কঠোরতা বা সন্দেহজনক প্রশ্নোত্তর বাড়লে হুন্ডির প্রতি ঝুঁকে যেতে পারেন অনেক প্রবাসী। আবার নীতি পরিবর্তন করে প্রণোদনা বন্ধ করে দিলে এর ফলেও বাড়তে পারে হুন্ডির ব্যবহার।

এ ব্যাপারে শাবিপ্রবির অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আব্দুল হান্নান প্রধান বলেন, ‘এনবিআরে দুইটা বিভাগ করার উদ্দেশ্য হচ্ছে নীতিনির্ধারণীতে একটা দল থাকবে, যারা পর্যবেক্ষণ করবে। আর এ পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী যথাযথ প্রক্রিয়া, আইন, সংশোধন, বর্ধন, পরিমার্জন প্রয়োজন হলে তা করবেন। আরেকটা গ্রুপ পূর্বের মতোই ব্যবস্থাপনায় থাকবেন।‌‌ 

তিনি বলেন, ‌'এখানে আমার আপাতত দৃষ্টিতে মনে হচ্ছে না প্রশাসন কঠোরতা আনতে যাচ্ছে, আর এ জন্য প্রবাসীরা হুন্ডির দিকে ঝুঁকবেন। এতটুকু যে পূ্র্বের বিষয়গুলো হয়তো একটু ঢেলে সাজাতে যাচ্ছেন সরকার।'

সিলেট বাংলাদেশের ৯৩ শতাংশ চা উৎপাদনের কেন্দ্র। দীর্ঘদিন ধরেই এই খাত নানান সংকটে নিমজ্জিত যেমন মূল্য পতন, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, অপ্রতুল ঋণ সুবিধা, শ্রমিক আন্দোলনে সৃষ্ট সংকট ইত্যাদি।

নতুন কর নীতি বিভাগের সিদ্ধান্ত চা শিল্পের জন্য কর ছাড় বা নীতিগত সুবিধা বয়ে আনতে পারে। তবে যদি রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগ কর আদায় কড়াকড়ি করে, তাহলে এই খাত আরও ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

বাংলাদেশীয় চা সংসদের সদস্য এবং এম আহমেদ টি অ্যান্ড ল্যান্ডস কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. সাফওয়ান চৌধুরী বলেন, ‘আমি এ বিষয়ে অবগত নয়, সার্বিকভাবে বিষয়টি বুঝতে হবে। সরকার যা ভাল মনে করে, তা করতে পারে; তবে তা যেন কোনভাবে চা শিল্পের জন্য ক্ষতিকর না হয় এটাই আমরা চাইবো।’

হাওরাঞ্চলে প্রতিবছর প্রায় ১০ লাখ মেট্রিক টন বোরো ধান উৎপাদিত হয়। নতুন কাঠামোয় যদি সার, কৃষি যন্ত্র, ও কৃষি উপকরণ আমদানির ওপর কর বাড়ে, তাহলে খরচ বেড়ে যাবে কৃষকের। আবার যন্ত্রপাতি ক্রয়ে কৃষিঋণ সহায়তাসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা প্রদান করা গেলে কৃষিতে আসতে পারে বৈপ্লবিক পরিবর্তন।

অপরদিকে মৎস্য উৎপাদনের দিক থেকেও হাওর অন্যতম। যদি এই খাতে শিল্পায়নের মতো নীতিগত সহায়তা দেয়া হয়, তাহলে হাওর হতে পারে দেশের অন্যতম রপ্তানিযোগ্য মৎস্য খাত।

হাওর এরিয়া আপলিফটমেন্ট সোসাইটির নির্বাহী পরিচালক সালেহীন চৌধুরী বলেন, ‌‌ ‘হাওরাঞ্চলের জলমহাল রাজস্ব খাতের অধীন কিন্তু ব্যাপকভাবে দুর্নীতিগ্রস্থ ও সিন্ডিকেটের কবলে। এখানে এক শ্রেণীর ব্যবসায়ী তাদের অবৈধ সম্পদ গোপনে লগ্নি করে কয়েকগুণ লাভের পাশাপাশি অর্থের বৈধতা নিশ্চিত করেন যা রাজস্ব বিভাগ জানলেও কখনো ব্যবস্থা নেয়নি। এনবিআরের বিভক্তির ফলে এ বিষয়টি গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা গেলে হাওরাঞ্চলের মৎসখাতের ব্যাপক উন্নয়ন সম্ভব হবে।’ 

এনবিআর বিলুপ্তির সিদ্ধান্ত দেশে কর প্রশাসনকে ঢেলে সাজানোর একটি বড় পদক্ষেপ। তবে এই কাঠামোতে আঞ্চলিক বাস্তবতা বিবেচনায় আনার আহবান জানিয়েছেন সিলেটের ব্যবসায়ীক নেতৃবৃন্দ।

সিলেট চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রির সদ্য সাবেক সভাপতি মজিবুর রহমান বলেন, ‘জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ভেঙে দুটি বিভাগ হয়েছে, আমি মনে করি এতে সিলেটের পর্যটন ও চা শিল্প থেকে শুরু করে সর্বস্তরে সুফল বয়ে আনবে। কেননা যারা ট্যাক্স আদায় করেন তারাই আবার নীতি নির্ধারক থাকেন, এতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা ভাল ছিলো না।’

তিনি বলেন, ‘নীতি গ্রহণ ও ব্যবস্থাপনা পৃথকীকরণে দেশের অন্যতম এ অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক খাত ভালভাবে মূল্যায়িত হবে। আর করের প্রভাব ও পুণনির্ধারণ যেহেতু এখনো সুনির্দিষ্ট না, সুতরাং এটা নিয়ে কথা না বলাই ভাল হবে। যখন হবে তখন দেখা যাবে।’

এই সম্পর্কিত আরো