এক পোর্টালে দুর্নীতির অভিযোগ, অন্য পোর্টালে প্রশংসার ঢেউ—প্রশ্নের মুখে বন্দর ব্যবস্থাপনা ও গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা সিলেটের গুরুত্বপূর্ণ তামাবিল স্থল বন্দরকে ঘিরে সৃষ্টি হয়েছে বিতর্ক, বিভ্রান্তি এবং প্রশ্নের ঘূর্ণাবর্ত।
একদিকে রাজস্ব ফাঁকি ও দুর্নীতির গুরুতর অভিযোগ তুলে তদন্ত দাবি করা হচ্ছে, অন্যদিকে একই বন্দরকে ‘নিয়ম মেনে পরিচালিত’ দাবি করে সাফাই গাওয়া হচ্ছে বিভিন্ন মাধ্যমে। এতে জনমনে তৈরি হয়েছে গভীর সংশয়—আসল সত্য কোনটি?
১৯ মার্চ ২০১৬ তারিখে একটি অনলাইন পোর্টালে প্রকাশিত প্রতিবেদনে তামাবিল স্থল বন্দরে ব্যাপক রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ আনা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, বন্দর ও কাস্টমসের কিছু অসাধু কর্মকর্তা, স্থানীয় প্রভাবশালী মহল এবং ব্যবসায়ীদের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম চালিয়ে যাচ্ছে।
সরেজমিন অনুসন্ধানে উঠে আসে, কয়েকটি সিএনএফ (ক্লিয়ারিং অ্যান্ড ফরওয়ার্ডিং) এজেন্টের সহযোগিতায় গড়ে ওঠা এই চক্র পণ্যের ঘোষণাপত্রে কারসাজি করে প্রকৃত পরিমাণের তুলনায় কম দেখিয়ে ছাড়পত্র নিচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, ৫ টনের ট্রাকে ১৪-১৫ টন এবং ১২ টনের ট্রাকে ২৩-২৫ টন পর্যন্ত পণ্য পরিবহন করা হলেও কাগজে তা কম দেখানো হচ্ছে।
এর ফলে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের। অতিরিক্ত পণ্যের বিপরীতে অনিয়মিত অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট একটি মহল আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছে বলেও অভিযোগ উঠে এসেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যবসায়ী জানান, “উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্ত হলে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসবে। প্রতিবছর শত শত কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার।” তবে অভিযোগ অস্বীকার করে তামাবিল পোর্টের কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “এ ধরনের কোনো অভিযোগ আমার জানা নেই।”
একইভাবে তামাবিল কাস্টমস সুপার শ্রাবানা বলেন, “বিষয়টি আমাদের জানা নেই, তবে যাচাই করে দেখা হচ্ছে।”
এর ঠিক ১৩ দিন পর, পহেলা এপ্রিল ২০২৬-এ কয়েকটি অনলাইন পোর্টালে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র তুলে ধরা হয়। সেখানে দাবি করা হয়—“তামাবিল স্থল বন্দর দিয়ে ফের পাথর আমদানি শুরু, রাজস্ব আদায়ে কঠোর অবস্থানে পোর্ট ও কাস্টমস কর্তৃপক্ষ।”
প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, রমজানের ঈদের ছুটি শেষে বন্দর পুনরায় চালু হলে পাথর আমদানি শুরু হয় এবং শ্রমিকদের কর্মচাঞ্চল্য ফিরে আসে। বন্দর কর্তৃপক্ষ নাকি নিয়ম মেনে গাড়ির ওজন ও পরিমাপ যাচাই করে পণ্য খালাস করছে। এমনকি সাম্প্রতিক অভিযোগের পর কর্তৃপক্ষ আরও সতর্ক হয়ে রাজস্ব আদায়ে কঠোরতা বৃদ্ধি করেছে বলেও উল্লেখ করা হয়।
এই পরস্পরবিরোধী সংবাদে জনমনে দেখা দিয়েছে তীব্র প্রশ্ন- আসলেই কি তামাবিল স্থল বন্দরে অনিয়ম ও রাজস্ব ফাঁকি চলছে?নাকি ‘মিডিয়াবাজি’র আড়ালে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সংবাদ প্রকাশ করে বিভ্রান্তি তৈরি করা হচ্ছে?
এমনকি কেউ কেউ প্রশ্ন তুলছেন—সাংবাদিকতার নাম ব্যবহার করে কি কোনো মহল অর্থ লেনদেনের খেলায় মেতে উঠেছে?
এ বিষয়ে পুনরায় যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তামাবিল কাস্টমস সুপার শ্রাবানা ফোন রিসিভ করেননি।
এমন পরিস্থিতিতে সচেতন মহল বলছেন, বিভ্রান্তি দূর করতে এবং সত্য উদঘাটনে অবিলম্বে উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি। একইসঙ্গে গণমাধ্যমের দায়বদ্ধতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাও সময়ের দাবি বলে মনে করছেন তারা।