লিবিয়া হয়ে সাগরপথে ইউরোপের দেশ গ্রিসে যাওয়ার স্বপ্নই কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার ৬টি পরিবারের জন্য। মাঝসাগরে নৌযান বিকল হয়ে পড়ার পর টানা কয়েকদিন ভাসমান অবস্থায় অনাহার ও তীব্র পানির সংকটে একে একে প্রাণ হারিয়েছেন তারা। এই মর্মান্তিক খবরে এলাকায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া, স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে হাওরাঞ্চলের জনপদ দিরাই।
স্বজনদের বরাত দিয়ে জানা যায়, একই নৌকায় থাকা একজন জীবিত বাংলাদেশি গ্রিসে পৌঁছে ফোনে ঘটনাটি জানান।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে নিহত সাজিদুর রহমানের পিতা আব্দুল গণি বলেন, আমার ছেলের সাথে যারা ছিল, তাদের একজন জানিয়েছে নৌকাটি মাঝ সাগরে পথ হারিয়ে ফেলে। পরে জ্বালানি শেষ হয়ে গেলে ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে যায়। এরপর থেকেই শুরু হয় দুর্বিষহ পরিস্থিতি।
তিনি আরও জানান, খোঁজ নিয়ে জানতে পারি, নৌকাটি টানা ছয় দিন সাগরে ভাসমান ছিল। অনাহার আর পানির তীব্র সংকটে একে একে অনেকেই মারা যায়। কেউ কেউ সাগরের পানি পান করেও বাঁচতে পারেনি। পরে পাচারকারীরা মরদেহ সাগরে ফেলে দেয়।
সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্যমতে, নিহত বাংলাদেশিদের মধ্যে এখন পর্যন্ত দিরাই উপজেলার ৬ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। তারা হলেন, উপজেলার তারাপাশা গ্রামের আবু সাঈদ সরদারের ছেলে নুরুজ্জামান সরদার ময়না (৩০), আব্দুল গণির ছেলে সাজিদুর রহমান (২৮), ইসলাম উদ্দিনের ছেলে শাহান মিয়া (২৫), রনারচর গ্রামের আব্দুল মালেকের ছেলে মুজিবুর রহমান (৩৮), বাসুরী গ্রামের ছালিকুর রহমানের ছেলে সোহানুর রহমান এহিয়া (২১) এবং মাটিয়াপুর গ্রামের তারেক মিয়া (২২)। একই নৌকায় থাকা গ্রামের রোহান আহমেদ গ্রিসে পৌঁছে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বলে জানিয়েছেন স্বজনরা।
নিহত সোহানুর রহমান এহিয়ার চাচাতো ভাই রিরাজ উদ্দিন কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, আমার ভাই এহিয়া এক মায়ের এক ছেলে। তাকে হারিয়ে তার বাবা-মা কেঁদে কেঁদে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। সদাহাস্যোজ্জ্বল এহিয়ার মৃত্যুর খবরে পুরো গ্রাম শোকে স্তব্ধ।
এ ঘটনায় এলাকায় ক্ষোভও বিরাজ করছে। স্থানীয়রা দালালচক্রের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে দিরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সনজীব সরকার বলেন, তিনি সরেজমিনে নিহতদের বাড়িতে গিয়ে স্বজনদের সঙ্গে কথা বলেছেন এবং পরিবারগুলো মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। তিনি জানান, মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে ইতোমধ্যে যোগাযোগ করা হয়েছে এবং প্রক্রিয়াটি চলমান রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, প্রাথমিকভাবে জানা গেছে তারাপাশা গ্রামের মুজিবুর রহমান নামের এক মানবপাচারকারীর মাধ্যমে তারা লিবিয়া গিয়েছিল, সে বর্তমানে পলাতক রয়েছে। জড়িত দালালচক্রকে শনাক্ত করে তাদের আইনের আওতায় আনতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পাশাপাশি তিনি উল্লেখ করেন, বিদেশে মৃত্যুবরণকারী বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে যে আর্থিক অনুদান প্রদান করা হয়, নিহতদের পরিবারকে সেই অনুদান পাওয়ার বিষয়ে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হবে।
স্বপ্নের ইউরোপযাত্রা যে এভাবে মৃত্যুপুরীতে রূপ নেবে এমন করুণ পরিণতি কেউ কল্পনাও করেনি। এখন শোক, হতাশা আর ক্ষোভই ভর করেছে দিরাইয়ের মানুষের মনে।