ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর-এর আগমন লাউঞ্জে ১২ ফেব্রুয়ারি বিকেলের ভিড়ে দেখা গেল এক নিঃশব্দ নারীকে। চোখে শূন্যতার ছায়া, মুখে শব্দের অভাব, যেন তিনি পুরো বিশ্বকে ভুলে গিয়েছেন। নিজের নাম, ঠিকানা বা পরিবারের কোনো তথ্য বলতে পারছিলেন না। পরে জানা যায়, তাঁর নাম রিজিয়া বেগম। সৌদি আরব থেকে দেশে ফেরার পর এই নারী ১৩ দিন ধরে ছিলেন পরিচয়হীন, ঠিকানাহীন—একটি ভাঙা মন ও ক্লান্ত শরীর নিয়ে একা, নিঃশব্দ নিপীড়নের ছায়ার মাঝে দাঁড়িয়ে।
তাঁর শারীরিক ও মানসিক অবস্থা দেখে সিভিল অ্যাভিয়েশন সিকিউরিটি (এভসেক) সদস্যরা তাৎক্ষণিকভাবে নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করেন। আশ্রয় মেলে ব্র্যাক-এর মাইগ্রেশন ওয়েলফেয়ার সেন্টারে। কিন্তু সেখানেও বড় প্রশ্ন ছিল—এই নারী কে? কোথায় তাঁর বাড়ি? কারা তাঁর স্বজন?
রিজিয়ার কাছে ছিল না কোনো পাসপোর্ট, জাতীয় পরিচয়পত্র বা ব্যক্তিগত নথি। তিনি কথা বলছিলেন না। ফলে পরিচয় শনাক্ত করা হয়ে ওঠে জটিল। বিষয়টি গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর শুরু হয় ব্যাপক অনুসন্ধান। অবশেষে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) সহায়তায় তাঁর আঙুলের ছাপ সংগ্রহ করে জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্যভান্ডারের সঙ্গে মিলিয়ে নিশ্চিত হওয়া যায়—তিনি মৌলভীবাজার জেলার বড়লেখা উপজেলার মামদনগর গ্রামের বাসিন্দা, তিন সন্তানের মা।
এই ১৩ দিনে তাঁর পরিবার প্রায় আশা ছেড়ে দিয়েছিল। ২০১৯ সালে গ্রামের এক দালালের মাধ্যমে ঢাকার একটি রিক্রুটিং এজেন্সির সহায়তায় তিনি সৌদি আরবে গৃহকর্মী হিসেবে গিয়েছিলেন। শুরু থেকেই নির্যাতনের অভিযোগ ছিল। ২০২১ সালের পর তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। অভিযোগ করা হলেও কোনো কার্যকর প্রতিকার মেলেনি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিবার ধরে নিয়েছিল—রিজিয়া হয়তো আর বেঁচে নেই।
মঙ্গলবার উত্তরায় ব্র্যাকের মাইগ্রেশন ওয়েলফেয়ার সেন্টারে যখন রিজিয়াকে পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হয়, তখন দৃশ্যটি ছিল বেদনাময়। তিন সন্তানের কান্না আর মায়ের নীরবতা যেন একই ফ্রেমে আটকে যায়। মেয়ের কণ্ঠে অসহায়তা—মায়ের চেহারা এত বদলে গেছে যে চিনতেই পারছিলাম না। মা এখনও কথা বলছেন না।
রিজিয়ার গল্পের পাশেই উঠে আসে আরও এক নারীর কাহিনি। রিমা আক্তার (ছদ্মনাম), দুই সন্তানের জননী। ছোটবেলায় মা–বাবা হারিয়ে এতিমখানায় বড় হওয়া রিমা সংসারের দায়ে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে সৌদি আরবে পাড়ি জমান। কিন্তু কাজের বদলে তাঁকে একাধিকবার বিক্রি করা হয় বলে তাঁর অভিযোগ। শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হতে হতে একপর্যায়ে তিনি পুলিশের হাতে সোপর্দ হন। তখনই জানতে পারেন তিনি অন্তঃসত্ত্বা। বিচার বা সুরক্ষা নয়, ৯ ফেব্রুয়ারি তাঁকে দেশে ফেরত পাঠানো হয়।
ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা রিমা এখন নিরাপদ আবাসন, চিকিৎসা ও আইনি সহায়তার অপেক্ষায়। তাঁর কণ্ঠে আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তা—আমার সন্তানের ভবিষ্যৎ কী হবে?
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিদেশ থেকে নির্যাতিত নারী কর্মীদের পরিচয় শনাক্তে এই প্রথম পিবিআই সরাসরি উদ্যোগ নিল। তবে মানব পাচার ও প্রবাসী নারী শ্রমিকদের সুরক্ষায় প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়ের অভাব স্পষ্ট। বিমানবন্দরে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ও নির্যাতিত নারীদের সহায়তায় সুসংহত কোনো স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (এসওপি) না থাকায় তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত অনেক সময় নির্ভর করে ব্যক্তিগত উদ্যোগের ওপর।
প্রতি বছর জীবিকার তাগিদে হাজারো নারী মধ্যপ্রাচ্যে যান। তাঁদের কেউ নীরবে নির্যাতন সহ্য করেন, কেউ নিখোঁজ হন, কেউ ফিরে আসেন ভাঙা শরীর ও বিধ্বস্ত মন নিয়ে। রিজিয়া ও রিমার গল্প সেই বৃহত্তর বাস্তবতারই প্রতিচ্ছবি।
রিজিয়া এখনও নীরব। তাঁর চোখে ভয় আর ক্লান্তি। তবু তিন সন্তান তাঁকে ঘিরে বসে আছে—নতুন করে শুরু করার ক্ষীণ আশায়। আর রিমা, অনাগত সন্তানকে নিয়ে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের সামনে দাঁড়িয়ে, অপেক্ষা করছেন ন্যায়বিচার ও নিরাপত্তার।
এই দুই নারীর ফিরে আসা শুধু ব্যক্তিগত বেদনার গল্প নয়,এটি রাষ্ট্র, সমাজ ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কাছে এক কঠিন প্রশ্ন—আর কত রিজিয়া, কত রিমা অন্ধকার পেরিয়ে এমনভাবে ফিরে আসবেন? এখন প্রয়োজন কাঠামোগত সুরক্ষা, জবাবদিহি এবং মানবিক দায়িত্বের বাস্তব প্রয়োগ।