আর মাত্র একদিন পরেই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য এই নির্বাচনকে ঘিরে সারাদেশের মতো হবিগঞ্জ-২ (বানিয়াচং–আজমিরীগঞ্জ) আসনেও বিরাজ করছে উৎসবমুখর ও প্রতিযোগিতাপূর্ণ পরিবেশ। শেষ মুহূর্তের প্রচারণায় বড় দুই জোটের প্রার্থীদের আন্তরিকতা ও শালীন আচরণ নজর কেড়েছে সাধারণ ভোটারদের।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) আয়োজিত সভায় প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের এক মঞ্চে বক্তব্য প্রদান নির্বাচনী পরিবেশকে আরও ইতিবাচক করেছে। গ্রাম থেকে উপজেলা সদর—সর্বত্রই এখন বইছে নির্বাচনী হাওয়া। প্রচারণার শেষ পর্যায়ে এসে গত সোমবার বড় দুই জোটের প্রার্থীদের সমর্থনে পৃথক গণমিছিল অনুষ্ঠিত হয়, যা মাঠের রাজনীতিতে বাড়তি উত্তাপ সৃষ্টি করেছে।
এবারের নির্বাচনে এ আসনে মোট পাঁচজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তবে মাঠ জরিপ ও জনমতের আলোচনায় দুই জোটের দুই হেভিওয়েট প্রার্থীই মূল প্রতিযোগী হিসেবে উঠে এসেছেন। বিএনপি, জমিয়তে ওলামায়ে ইসলাম ও গণঅধিকার পরিষদ জোটের প্রার্থী আবু মনসুর সাখাওয়াত হাসান জীবন ধানের শীষ প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। অপরদিকে জামায়াতে ইসলামী ও খেলাফত মজলিশসহ ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী মাওলানা আব্দুল বাছিত আজাদ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন দেয়াল ঘড়ি প্রতীকে।
দীর্ঘদিন ধরেই এই দুই প্রার্থীর মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার আলোচনা চললেও, স্থানীয়দের মতে গত ৯ ফেব্রুয়ারি ধানের শীষের বিশাল গণমিছিল নির্বাচনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে।
মাঠ পর্যায়ের বিশ্লেষণে দেখা যায়, ডাক্তার জীবন গত ১৮ বছর ধরে সংসদীয় এলাকায় সক্রিয়ভাবে বিচরণ করছেন। এলাকার মানুষের সুখ-দুঃখে পাশে থেকে তিনি স্থানীয় নাগরিক সমস্যা সম্পর্কে গভীরভাবে অবগত হয়েছেন। পেশাগত জীবনে চিকিৎসক হওয়ায় বানিয়াচং ও আজমিরীগঞ্জের মানুষের সঙ্গে তার রয়েছে নিবিড় সম্পর্ক। দীর্ঘ এই পথচলায় তিনি এলাকায় ‘গরীবের ডাক্তার’ হিসেবেও পরিচিতি পেয়েছেন।
অন্যদিকে মাওলানা আব্দুল বাছিত আজাদ একজন পরিচিত ধর্মীয় নেতা হিসেবে বিশেষ করে বানিয়াচং সদরে ব্যাপক পরিচিত। তার ভক্ত ও অনুসারীরা তাকে ‘বড় হুজুর’ নামেই সম্বোধন করে থাকেন।
৩ লাখ ৯১ হাজার ৯৬৯ ভোটারের এই আসনের চিত্র বলছে, বানিয়াচং–আজমিরীগঞ্জ এলাকায় ডাক্তার জীবনের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা দীর্ঘদিনের। বিশেষ করে দুই উপজেলার হিন্দু সম্প্রদায়ের বড় একটি অংশের সঙ্গে তার ব্যক্তিগত সম্পর্ক রয়েছে। সংখ্যালঘু ভোটারদের মধ্যেও গুঞ্জন রয়েছে—দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও স্থানীয় সমস্যা সমাধানের কথা বলছেন তিনি।
এ আসনে পুরুষ ভোটার সংখ্যা ১ লাখ ৯৭ হাজার ৬৪২ জন, নারী ভোটার ১ লাখ ৯৪ হাজার ৩২৩ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন ৪ জন। বিশাল এই জনগোষ্ঠীর প্রধান দাবির মধ্যে রয়েছে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন, ড্রেনেজ সমস্যা সমাধান এবং মাদক নির্মূল।
কথা প্রসঙ্গে সুজনের বানিয়াচং উপজেলা সভাপতি কৃষক দেওয়ান সোয়েব রাজা বলেন, “বড় দুই জোটের প্রার্থীদের প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যেও পারস্পরিক সৌহার্দ্য ভোটারদের মধ্যে স্বস্তি এনে দিয়েছে। ছোটখাটো অভিযোগ ছাড়া বড় কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটায় নির্বাচন ঘিরে উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, খেলাফত মজলিশের আমির মাওলানা আব্দুল বাছিত আজাদ জামায়াত-শিবিরের কর্মী, ধর্মীয় জনভিত্তি ও অনুসারীদের শক্তিকে কাজে লাগিয়ে মাঠে প্রভাব বিস্তার করলেও, গত সোমবার বানিয়াচংয়ে অনুষ্ঠিত ধানের শীষের স্মরণকালের গণমিছিল ভোটের হিসাব-নিকাশে নতুন সমীকরণ যোগ করেছে।
শেষ পর্যন্ত বানিয়াচং–আজমিরীগঞ্জের ভোটাররা অভিজ্ঞ চিকিৎসক ও দীর্ঘদিনের পরিচিত মুখ ডাক্তার জীবনকে বেছে নেবেন, নাকি ইসলামী শরিয়া শাসনের ডাক দেওয়া ‘বড় হুজুর’ খ্যাত মাওলানা আব্দুল বাছিত আজাদের পক্ষে রায় দেবেন—তা জানা যাবে ভোটের ফলাফলেই।