বুধবার, ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
বুধবার, ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
✔ বাংলা টেক্সট কনভার্টার
শিরোনাম
advertisement
সিলেট বিভাগ

ভোটাধিকার পেলেও অধিকার বঞ্চিত তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ

রাষ্ট্র তাদের ভোটাধিকার স্বীকৃতি দিয়েছে বহু আগেই। জাতীয় পরিচয়পত্রে তৃতীয় লিঙ্গ হিসেবে পরিচয় উল্লেখ আছে, ভোটার তালিকায় রয়েছে নাম—নিয়মিতভাবেই তারা জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচনে ভোটও দিয়ে থাকেন। তবু বাস্তব জীবনে সেই নাগরিকত্বের স্বীকৃতি যেন কাগজের গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ থেকে গেছে সিলেটের তৃতীয় লিঙ্গ জনগোষ্ঠীর জন্য। ভোটাধিকার থাকলেও নাগরিক জীবনের মৌলিক অধিকারের প্রশ্নে তারা আজও পিছিয়ে, অবহেলিত ও উপেক্ষিত। সিলেট নগরী ও আশপাশের এলাকায় বসবাসকারী 

তৃতীয় লিঙ্গের মানুষরা বলছেন- ভোট দেওয়ার অধিকার থাকলেও শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, কর্মসংস্থান ও সামাজিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে তারা এখনো চরম বৈষম্যের শিকার। অনেকেই নিয়মিতভাবে জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিলেও রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত থেকে যাচ্ছেন। সরকারি দপ্তর, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কিংবা কর্মক্ষেত্রে গেলে পরিচয়ের কারণে নানা ধরনের অবহেলা, বিদ্রূপ ও বাধার মুখে পড়তে হয় বলে অভিযোগ তাদের।

তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ভোটের সময় তারা রাষ্ট্রের কাছে গুরুত্বপূর্ণ নাগরিক হিসেবে বিবেচিত হলেও নির্বাচনের পর সেই গুরুত্ব আর থাকে না। রাজনৈতিক দলগুলো প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবায়নের কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ দেখা যায় না। ফলে নাগরিক হিসেবে দায়িত্ব পালনের পরও অধিকার আদায়ে তারা বারবার হতাশার মুখোমুখি হন। এই বাস্তবতা তৃতীয় লিঙ্গ জনগোষ্ঠীর মধ্যে গভীর অনিশ্চয়তা ও বঞ্চনার অনুভূতি তৈরি করছে, যা একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থার ধারণাকেই প্রশ্নের মুখে ফেলছে।

এ বিষয়ে হিজড়া জনগোষ্ঠীর সঙ্গে কথা বললে— হিজড়া যুব কল্যাণ সংস্থার সভাপতি সুক্তা হিজড়া বলেন- রাষ্ট্র আমাদের ভোটাধিকার দিয়েছে, কিন্তু সামাজিক ও অর্থনৈতিক অধিকার এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত হয়নি। নির্বাচন এলেই রাজনৈতিক দলগুলো আমাদের কাছে আসে, নানা প্রতিশ্রুতি দেয়; কিন্তু ভোটের পর সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন আর দেখা যায় না। আমরা চাই, তৃতীয় লিঙ্গ জনগোষ্ঠীর শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও নিরাপত্তার বিষয়গুলো সংসদে গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হোক এবং বাজেট ও নীতিনির্ধারণে তার প্রতিফলন থাকুক।

তিনি আরও বলেন, ভোট দিতে গেলে সবাই বলে আমরা নাগরিক। কিন্তু চাকরি চাইলে বলা হয়—আমাদের জন্য নাকি কোনো জায়গা নেই। তাহলে নাগরিকত্বটা কি শুধু ভোটের সময়ই কার্যকর? রাষ্ট্র যদি সত্যিই আমাদের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দেয়, তবে সেই স্বীকৃতি জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে দৃশ্যমান হতে 

তৃতীয় লিঙ্গের আরেক সদস্য পায়েল হিজড়া বলেন- আমরা নিয়মিত ভোট দিই, ভোটার তালিকায় আমাদের নামও আছে। কিন্তু নির্বাচন এলেই আমাদের শুধু একটি সংখ্যা হিসেবে দেখা হয়, নাগরিক হিসেবে নয়। ভোটের সময় আমাদের গুরুত্ব দেওয়া হলেও ভোটের পর শিক্ষা, কাজ ও নিরাপত্তার বিষয়গুলো আর কারও অগ্রাধিকারে থাকে না। ফলে জীবনের মৌলিক চাহিদা পূরণে আমরা প্রতিদিন লড়াই করে যাই।

তিনি আরও বলেন, সমাজ ও রাষ্ট্র আমাদের কাছ থেকে দায়িত্ব পালন আশা করে, কিন্তু অধিকার দেওয়ার প্রশ্নে নীরব থাকে। এই দ্বিচারিতা আমাদের গভীরভাবে আহত করে এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি করে। আমরা চাই, ভোট শুধু ব্যালট বাক্সে সীমাবদ্ধ না থেকে আমাদের মর্যাদা, নিরাপদ জীবন ও টেকসই জীবিকার পথ খুলে দিক।

তৃতীয় লিঙ্গকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দিলেও মাঠপর্যায়ে তার বাস্তবায়ন খুবই সীমিত। সিলেটে সরকারি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে তৃতীয় লিঙ্গের জন্য কার্যকর কোনো কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা চোখে পড়ে না। ফলে বাধ্য হয়ে অনেকেই ভিক্ষা বা অনিরাপদ পেশায় জড়িয়ে পড়ছেন।

স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রেও বৈষম্য প্রকট। সরকারি হাসপাতালে গেলে পরিচয় জানার পর অনেক সময় অবহেলার শিকার হতে হয় বলে অভিযোগ তাদের। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে টিকে থাকাও কঠিন—বুলিং, সামাজিক চাপ আর পারিবারিক প্রত্যাখ্যানের কারণে অনেকেই পড়াশোনা ছেড়ে দিতে বাধ্য হন।

মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, ভোটাধিকার নিশ্চিত করলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। প্রয়োজন সমন্বিত নীতি, বাস্তবভিত্তিক কর্মসংস্থান এবং সামাজিক সচেতনতা।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ, সিলেট জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক রওশন আরা মুকুল বলেন— তৃতীয় লিঙ্গের জনগোষ্ঠীকে কেবল সুবিধাভোগী হিসেবে দেখলে চলবে না,তাদের মর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। আজ তারা আর করুণা বা দয়ার প্রত্যাশী নয়, তারা সমান নাগরিক অধিকার দাবি করে। ভোটকেন্দ্রের লাইনে যেমন তারা দাঁড়ান, ঠিক তেমনি স্কুল, হাসপাতাল ও কর্মক্ষেত্রেও যেন মানুষ হিসেবে পূর্ণ স্বীকৃতি পান—এটাই তাদের চাওয়া। রাষ্ট্র যদি সত্যিকার অর্থে অন্তর্ভুক্তিমূলক হতে চায়, তবে ভোটাধিকারসহ সকল নাগরিক অধিকার কাগজে নয়, বাস্তব জীবনে নিশ্চিত করাই এখন সময়ের দাবি।

তিনি আরও বলেন, নীতিনির্ধারকদের এখনই মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে, নইলে এই জনগোষ্ঠীর প্রতি রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব অপূর্ণই থেকে যাবে।

এ বিষয়ে সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) সিলেট এর সভাপতি এডভোকেট সৈয়দা শিরীন আক্তার বলেন- সংবিধান সকল নাগরিকের সমান অধিকারের নিশ্চয়তা দিলেও বাস্তবে তৃতীয় লিঙ্গের মানুষরা আজও বৈষম্যের শিকার। আইনগত স্বীকৃতি থাকলেই হবে না, তার কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করাটাই সবচেয়ে জরুরি। ভোটাধিকার, শিক্ষা, চিকিৎসা ও কর্মসংস্থানে তাদের সমান সুযোগ নিশ্চিত না করা হলে রাষ্ট্র আইনের শাসনের দাবিও পূরণ করতে পারে না। তৃতীয় লিঙ্গের জনগোষ্ঠীর অধিকার রক্ষা করা কোনো করুণা নয়,এটি একটি আইনি ও নৈতিক বাধ্যবাধকতা।

এ বিষয়ে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. তাহমিনা ইসলাম বলেন— তৃতীয় লিঙ্গের জনগোষ্ঠীকে সমাজের মূলধারা থেকে আলাদা করে রাখার প্রবণতা আমাদের গভীর মানবিক সংকটেরই প্রতিফলন। পরিচয়ের স্বীকৃতি দেওয়া যথেষ্ট নয়, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, কর্মসংস্থান ও নিরাপদ জীবন নিশ্চিত করাই আসল চ্যালেঞ্জ। রাষ্ট্র ও সমাজ যদি সমান সুযোগের পরিবেশ তৈরি না করে, তাহলে কোনো উন্নয়নই টেকসই হতে পারে না। তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের অধিকার নিশ্চিত করা কোনো বিশেষ সুবিধা নয়-এটি একটি রাষ্ট্রের ন্যূনতম দায়িত্ব।

তিনি আরও বলেন- সচেতন নাগরিক সমাজ, নীতি নির্ধারক এবং স্থানীয় প্রশাসনের সম্মিলিত প্রচেষ্টা ছাড়া এই জনগোষ্ঠীর বাস্তব সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়। আমাদের লক্ষ্য হতে হবে তাদের সমাজের পূর্ণাঙ্গ অংশ হিসেবে গ্রহণ ও মর্যাদার সঙ্গে জীবন যাপন নিশ্চিত করা।

এই সম্পর্কিত আরো