জাতীয় নির্বাচনের রেশ কাটতে না কাটতেই আধ্যাত্মিক নগরী সিলেটে এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে সংরক্ষিত নারী সংসদ সদস্য পদ। বিশেষ করে রাজপথের লড়াইয়ে থাকা অভিজ্ঞ নেত্রীদের পাশাপাশি প্রভাবশালী রাজনৈতিক পরিবারের উত্তরসূরীদের নিয়ে রাজনৈতিক মহলে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। সিলেট বিভাগে সংরক্ষিত নারী আসনে সম্ভাব্য অন্তত ১০ জনের নাম আলোচনায় থাকলেও সবার নজর এখন তিন হেভিওয়েট নেত্রীর দিকে।
তারা হলেন—বিএনপি’র জাতীয় নির্বাহী কমিটির স্থানীয় সরকার বিষয়ক সহ-সম্পাদক ও সাবেক সংসদ সদস্য শাম্মী আক্তার, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক সচিব মরহুম আবুল হারিছ চৌধুরীর কন্যা ব্যারিস্টার সামিরা তানজিন চৌধুরী এবং যুক্তরাজ্য বিএনপি’র সাবেক সভাপতি ও খালেদা জিয়ার ঘনিষ্ঠ নেতা মরহুম কমর উদ্দিনের কন্যা সাবিনা খান পপি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সিলেট বিভাগ থেকে অন্তত দু’জন নারী সংসদ সদস্য হওয়ার সুযোগ রয়েছে। ফলে বিভাগের চার জেলা থেকেই জোর লবিং শুরু হলেও রাজনৈতিক অবস্থান, পারিবারিক ঐতিহ্য এবং বিগত দিনের সক্রিয়তায় এই তিন নেত্রীই দৌড়ে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছেন।
সংরক্ষিত আসনের দৌড়ে সবচেয়ে শক্তিশালী ও অভিজ্ঞ প্রার্থী হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে শাম্মী আক্তারকে। সাবেক এই সংসদ সদস্য বিগত ১৭ বছর বিএনপি’র প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রামে রাজপথে সক্রিয় ছিলেন। তার এই দীর্ঘ ত্যাগের কথা তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মুখে মুখে। যদিও রাজপথের লড়াই ও একাধিকবার কারাবরণের ধকলে তিনি বর্তমানে কিছুটা অসুস্থতায় ভুগছেন, তবুও রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও অভিজ্ঞতার বিচারে দলের নীতিনির্ধারণী মহলে তার অবস্থান অত্যন্ত সুসংহত।
পারিবারিক রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের মধ্য দিয়ে আলোচনায় এসেছেন ব্যারিস্টার সামিরা তানজিন চৌধুরী। বিএনপি’র একসময়ের প্রভাবশালী নেতা হারিছ চৌধুরীর মৃত্যুর পর তার উত্তরসূরী হিসেবে সামিরা সিলেটের রাজনীতিতে আবির্ভূত হন। বিশেষ করে সিলেট-৫ (কানাইঘাট-জকিগঞ্জ) আসনে তাকে নিয়ে সাধারণ মানুষের ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। উচ্চশিক্ষিত ও পেশাদার এই নেত্রীকে সংরক্ষিত আসনে দেখা গেলে এলাকার উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে বলে মনে করছেন স্থানীয় নেতাকর্মীরা।
লন্ডনের স্থানীয় রাজনীতি ও কাউন্সিলে অভিজ্ঞ সাবিনা খান পপি এবার নিজ জন্মভূমির সেবায় সক্রিয় হয়েছেন। প্রভাবশালী বিএনপি নেতা মরহুম কমর উদ্দিনের কন্যা হিসেবে তিনি তৃণমূল নেতাকর্মীদের মধ্যে গভীর আস্থা তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন। গত সংসদ নির্বাচনে সিলেট-৬ (গোলাপগঞ্জ-বিয়ানীবাজার) আসনে তিনি ব্যাপক জনমত গঠন করে আলোচনায় আসেন। মাঠ পর্যায়ে নিয়মিত গণসংযোগ ও জনসেবামূলক কাজের মাধ্যমে তিনি নিজের অবস্থান সুসংহত করেছেন।
এই তিনজনের পাশাপাশি গুম হওয়া ছাত্রদল নেতা ইফতেখার হোসেন দিনারের বোন ও সিলেট জেলা মহিলা দলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি তাহসিন শারমিন তামান্নাকেও ত্যাগী নেতা হিসেবে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। আওয়ামী লীগের বিগত শাসনামলে চরম নির্যাতনের শিকার হওয়া এই পরিবারের সদস্য হিসেবে তামান্নার প্রতি তৃণমূলের সহানুভূতি ও সমর্থন রয়েছে।
এদিকে, আলোচনায় রয়েছেন সাবেক এমপি মরহুম ড. সৈয়দ মকবুল হোসেনের কন্যা সৈয়দা আদিবা হোসেন। তবে স্থানীয় নেতাকর্মীদের অভিযোগ, সাবেক এমপি মরহুম ড. সৈয়দ মকবুল হোসেন বিএনপির দুঃসময়ে পাশে ছিলেন না। তিনি ২০০৮ সালে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করেছিলেন।
সিলেটের রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শেষ পর্যন্ত দলের হাইকমান্ড রাজপথের পরীক্ষিত ও অভিজ্ঞ নেতৃত্বের মূল্যায়ন করবে নাকি নতুন প্রজন্মের শিক্ষিত ও মেধাবী উত্তরসূরীদের সুযোগ দেবে—সেটিই এখন দেখার বিষয়। তবে সব মিলিয়ে শাম্মী আক্তার, ব্যারিস্টার সামিরা ও সাবিনা খান পপিকে ঘিরে সিলেটের নারী রাজনীতির ময়দান এখন বেশ উত্তপ্ত। দলের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে এই তিনজনের নামই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।