ইতিহাসসেরা ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশ আসনে ভূমিধস বিজয় নিশ্চিত করেছে। দলটি ইতোমধ্যে এককভাবে সরকার গঠনের যোগ্যতা অর্জন করেছে। অপরদিকে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী তার ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি আসন পেয়ে সংসদের বিরোধী দল হওয়ার গৌরব অর্জন করেছে।
কেন্দ্র থেকে ঘোষিত ফলাফল অনুযায়ী, দুই-তৃতীয়াংশ আসন পেয়েছে বিএনপি। স্বতন্ত্র প্রার্থীরা সাতটি আসনে বিজয়ী হয়েছে। বাকি আসনগুলোতে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট বিজয়ী হয়েছে। সারা দেশ থেকে প্রাপ্ত তথ্যমতে, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বড় ব্যবধানে বিজয়ী হয়েছে। নির্বাচনে ৭৫ শতাংশের বেশি ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়েছে বলে নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে। এদিকে কমিশনের সূত্র অনুযায়ী সংসদ নির্বাচনে ৬১ শতাংশ ভোট পড়েছে।
গতকাল গণতন্ত্রে উত্তরণের ভোট উৎসব অত্যন্ত সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়েছে। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে অনুষ্ঠিত হয় সংস্কারসম্পর্কিত গণভোট। দেশের ৩০০টি সংসদীয় আসনের মধ্যে ২৯৯টিতে ভোট হয়েছে। প্রার্থীর মৃত্যুর কারণে শেরপুর-৩ আসনের নির্বাচন স্থগিত করেছে নির্বাচন কমিশন। নির্বাচনে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট কাঙ্ক্ষিত ফল না পেলেও রাজধানীতে তুলনামূলকভাবে ভালো করেছে।
বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রথমবার দুটি আসনে নির্বাচনে দাঁড়িয়ে দুটিতেই বিজয়ী হয়েছেন। তিনি বগুড়া-৬ আসনে বিপুল ভোটে জয় পেলেও তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনে ঢাকা-১৭ আসনে সামান্য ব্যবধানে জিতেছেন। আনুষ্ঠানিক ফলাফল ঘোষণা না হলেও বিএনপি সংবাদ সম্মেলন করে দলের চেয়ারম্যানের অংশ নেওয়া দুটি আসনে জয়ের তথ্য জানিয়েছে। জামায়াত ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান ঢাকা-১৫ আসনে জয়লাভ করেছেন বলে দলটির ফেসবুক পেজে উল্লেখ করা হয়েছে। গভীর রাতে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত রিটার্নিং কর্মকর্তাদের কার্যালয় থেকে ঘোষিত ২৯৬টি আসনের বেসরকারি ফলাফলে বিএনপি ২০৭টি, জামায়াত জোট ৭৭টি (এনসিপি ৬) এবং স্বতন্ত্রসহ অন্যরা ১২টি আসনে জয়লাভ করেছে। শেরপুর-২, চট্টগ্রাম-৪ ও ৬ আসনের ফল মামলার কারণে স্থগিত আছে।
জুলাই বিপ্লবপরবর্তী মুক্ত পরিবেশে গতকাল অনুষ্ঠিত নজিরবিহীন শান্তিপূর্ণ সংসদ নির্বাচন ঈদ উৎসবে পরিণত হয়। এর মধ্য দিয়ে দেশ গণতন্ত্রে উত্তরণের চূড়ান্ত ধাপ পার করেছে। কোনো ধরনের সহিংসতা, বিশৃঙ্খলা ও অঘটন ছাড়াই অনুষ্ঠিত নির্বাচনকে ঈদ উৎসব বলে আখ্যায়িত করেন ভোটাররা। শান্তিপূর্ণ, সুশৃঙ্খল ও উৎসবমুখর পরিবেশে নির্বাচন সম্পন্ন হওয়ায় জাতির প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, এ নির্বাচন দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর হয়েছে। এ নির্বাচন মহা আনন্দের ও উৎসবের। এর মধ্য দিয়ে নতুন বাংলাদেশের অভূতপূর্ব যাত্রা শুরু হলো। এর আগে প্রধান উপদেষ্টা ভোট দিয়ে সবাইকে ‘ঈদ মোবারক’ জানান।
সারা দেশে সকাল সাড়ে ৭টা থেকে টানা বিকাল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। ভোটগ্রহণ শেষে প্রতিটি কেন্দ্রে ভোট গণনা করে রিটার্নিং কর্মকর্তারা বেসরকারিভাবে ফলাফল ঘোষণা করেন। পরে নির্বাচন কমিশন থেকেও রিটার্নিং কর্মকর্তাদের পাঠানো ফলাফল ঘোষণা করা হয়।
রাতভর বিতর্ক ও চরম উত্তেজনার পর ঢাকা-৮ আসনের বিএনপির মির্জা আব্বাসকে রিটার্নিং কর্মকর্তা বেসরকারিভাবে বিজয়ী ঘোষণা করেন। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী এনসিপির নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর চেয়ে ৪ হাজার ৯৮০ ভোট বেশি পেয়েছেন। মির্জা আব্বাস পেয়েছেন ৫৬ হাজার ৫৫২, পাটওয়ারী পেয়েছেন ৫১ হাজার ৫৭২ ভোট।
ঢাকা-১৬ আসনে বিএনপির আমিনুল হক হেরে গেছেন। এ আসনে জামায়াতের কর্নেল (অব.) আবদুল বাতেনকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়েছে।
ঢাকা-১৩ আসনে মাওলানা মামুনুল হকের প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির ববি হাজ্জাজকে বিজয়ী ঘোষণার পর নির্বাচন কমিশিনে গিয়ে প্রতিবাদ জানিয়েছে মামুনুল হক। জামায়াতে ইসলামীর একটি প্রতিনিধিদল নির্বাচন কমিশনে শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত অবস্থান করছিল।
ঘোষিত বেসরকারি ফলাফলে নীলফামারী-১ আসনে জামায়াতের মাওলানা আব্দুস সাত্তার, নীলফামারী-২ (সদর) আসনে জামায়াতের আল ফারুক আব্দুল লতিফ, নীলফামারী-৩ (জলঢাকা) আসনে জামায়াতের ওবায়দুল্লাহ সালাফী, নীলফামারী-৪ (সৈয়দপুর ও কিশোরগঞ্জ) আসনে জামায়াতের আব্দুল মুনতাকিম, কুড়িগ্রাম-৩ (উলিপুরা) আসনে জামায়াতের মাহবুবুল আলম সালেহী, কুড়িগ্রাম-৪ আসনে জামায়াতের মোস্তাফিজুর রহমান, রংপুর-২ আসনে জামায়াতের এটিএম আজহারুল ইসলাম, রংপুর-৪ আসনে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আখতার হোসেন, বগুড়া-১ আসনে বিএনপির কাজী রফিকুল ইসলাম, বগুড়া-২ আসনে বিএনপির মীর শাহে আলম, বগুড়া-৩ আসনে বিএনপির আবদুল মহিত তালুকদার, বগুড়া-৫ আসনে বিএনপির গোলাম মোহাম্মদ সিরাজ, বগুড়া-৬ আসনে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান, বগুড়া-৭ আসনে (গাবতলী ও শাজাহানপুর) বিএনপির মোরশেদ মিল্টন, পাবনা-১ (সাঁথিয়া) আসনে জামায়াতের নাজিবুর রহমান মোমেন, মাগুরা-১ আসনে বিএনপির মনোয়ার হোসেন, মাগুরা-২ আসনে বিএনপির নিতাই রায় চৌধুরী, ঝিনাইদহ-১ আসনে বিএনপির মো. আসাদুজ্জামান, খুলনা-৩ আসনে (সিটি করপোরেশনের ১ থেকে ১৫ নম্বর ওয়ার্ড, যোগীপোল ও আড়ংঘাটা ইউনিয়ন) বিএনপির রকিবুল ইসলাম (বকুল), খুলনা-৪ আসনে বিএনপির আজিজুল বারী হেলাল, খুলনা-৫ (ফুলতলা, ডুমুরিয়া ও গিলাতলা ক্যান্টনমেন্ট এলাকা) বিএনপির আলী আসগার (লবি), বরিশাল-৫ আসনে মজিবর রহমান সরওয়ার, নেত্রকোনা-১ (কলমাকান্দা-দুর্গাপুর) আসনে বিএনপির কায়সার কামাল, নেত্রকোনা-৪ আসনে বিএনপির লুৎফুজ্জামান বাবর, জামালপুর-১ (দেওয়ানগঞ্জ-বকশীগঞ্জ) আসনে এম রশিদুজ্জামান (মিল্লাত), জামালপুর-২ (ইসলামপুর) আসনে সুলতান মাহমুদ (বাবু), জামালপুর-৩ (মেলান্দহ-মাদারগঞ্জ) আসনে মোস্তাফিজুর রহমান (বাবুল), জামালপুর-৪ (সরিষাবাড়ী) আসনে ফরিদুল কবীর তালুকদার (শামীম), জামালপুর-৫ (সদর) আসনে শাহ্ মোহাম্মদ ওয়ারেছ আলী (মামুন), ঢাকা-২০ (ধামরাই) আসনে বিএনপির তমিজ উদ্দিন, মুন্সীগঞ্জ-১ (শ্রীনগর-সিরাজদিখান) আসনে বিএনপির মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ, মুন্সীগঞ্জ-২ (টঙ্গীবাড়ী-লৌহজং) আসনে বিএনপির আব্দুস সালাম আজাদ, মুন্সীগঞ্জ-৩ (সদর ও গজারিয়া) আসনে বিএনপির মোহাম্মদ কামরুজ্জামান, নরসিংদী-৩ আসনে মনজুর এলাহী, সুনামগঞ্জ-১ আসনে বিএনপির কামরুজ্জামান কামরুল, সুনামগঞ্জ-২ আসনে বিএনপির নাছির চৌধুরী, সুনামগঞ্জ-৩ আসনে (জগন্নাপুর ও শান্তিগঞ্জ) বিএনপির মোহাম্মদ কয়ছর আহমদ, সুনামগঞ্জ-৪ আসনে (সদর ও বিশ্বম্ভরপুর) বিএনপির নূরুল ইসলাম, সুনামগঞ্জ-৫ আসনে (ছাতক ও দোয়ারাবাজার) বিএনপির কলিম উদ্দিন আহমেদ, সিলেট-২ আসনে বিএনপির ইলিয়াস আলীর স্ত্রী তাহসিনা রুশদীর (লুনা), সিলেট-৩ আসনে বিএনপির এমএ মালিক, সিলেট-৪ (কোম্পানীগঞ্জ, গোয়াইনঘাট ও জৈন্তাপুর) আসনে বিএনপির আরিফুল হক চৌধুরী, হবিগঞ্জ-১ (নবীগঞ্জ-বাহুবল) আসনে বিএনপির রেজা কিবরিয়া, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬ আসনে গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি, লক্ষ্মীপুর-১ আসনে বিএনপির শাহাদাত হোসেন সেলিম, চট্টগ্রাম-১ (মিরসরাই) আসনে বিএনপির নুরুল আমিন, ঢাকা-২ আসনে বিএনপির আমানউল্লাহ আমান, চট্টগ্রাম-৩ (সন্দ্বীপ) আসনে বিএনপির মোস্তফা কামাল পাশা, চট্টগ্রাম-১৫ আসনে জামায়াতের শাহজাহান চৌধুরী, চট্টগ্রাম-১৬ (বাঁশখালী) আসনে জামায়াতের মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম, কক্সবাজার-১ আসনে বিএনপির সালাহউদ্দিন আহমেদ বিজয়ী হয়েছেন।
নির্বাচন নিয়ে বিএনপির পক্ষ থেকে সংসদ নির্বাচন ও গণভোট সম্পন্ন করায় নির্বাচন কমিশন, সশস্ত্র বাহিনী, অন্তর্বর্তী সরকার এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়েছে। অপরদিকে জামায়াতে ইসলামী বলেছে, বাংলাদেশের ইতিহাসে অনন্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি ও জামায়াত জোট উভয়েই বিজয়ের বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেছে।
প্রথমবারের মতো এবার সংসদ নির্বাচনে ভোটাররা বড় পরিসরে পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। এর আগে আইনে পোস্টাল ব্যালটে ভোটদানের সুযোগ থাকলেও এর প্রচলন ছিল না। ইসির তথ্যানুযায়ী, ১০ লাখ ৭৩ হাজার ৪৯৭ জন পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিয়েছেন। এর মধ্যে প্রবাসী চার লাখ ৭১ হাজার ৯৭৩ জন এবং দেশের ছয় লাখ এক হাজার ৫২৪ জন। প্রায় ১ শতাংশ ভোটার পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিয়েছেন।