বাংলাদেশি আলোচিত ইসলামি বক্তা মাওলানা মিজানুর রহমান আজহারীর ভিসা বাতিলের ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই একই সেমিনারে অংশ নিতে যাওয়া আরেক বক্তা শায়খ আহমাদুল্লাহর ভিসাও বাতিল করেছে অস্ট্রেলিয়া সরকার। ‘বিশ্বাসের উত্তরাধিকার’ শীর্ষক সেমিনার সিরিজকে ঘিরে এই দুই বক্তার ভিসা বাতিলের ঘটনায় প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটি, রাজনীতি ও গণমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি হয়েছে।
আয়োজক সংগঠন ইসলামিক প্র্যাকটিস অ্যান্ড দাওয়াহ সার্কেল (আইপিডিসি)-এর উদ্যোগে আয়োজিত এই সেমিনার সিরিজে অংশ নিতে আজহারী ব্রিসবেন, মেলবোর্ন, সিডনি ও ক্যানবেরায় বক্তব্য দেওয়ার উদ্দেশ্যে অস্ট্রেলিয়ায় গিয়েছিলেন। তবে সফরের মাঝপথে গত ৩১ মার্চ তার ভিসা বাতিল করে দেশত্যাগের নির্দেশ দেয় কর্তৃপক্ষ।
আজহারীর দেশত্যাগের পর আয়োজকরা সেমিনার চালিয়ে নিতে শায়খ আহমাদুল্লাহর ওপর নির্ভর করেন। আইপিডিসির ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত এ আয়োজনে তিনি ৩ এপ্রিল মেলবোর্নে এবং ৪ এপ্রিল সিডনিতে (ভিডিও সম্মেলনের মাধ্যমে) বক্তব্য রাখেন। পরবর্তীতে ক্যানবেরা, অ্যাডিলেড ও পার্থে তার অংশগ্রহণের কথা থাকলেও তা আর সম্ভব হয়নি।
৫ এপ্রিল আনুষ্ঠানিকভাবে শায়খ আহমাদুল্লাহর ভিসা বাতিল করে অস্ট্রেলিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এ বিষয়ে দেশটির অভিবাসন বিষয়ক সহকারী মন্ত্রী ম্যাট থিসলেথওয়েট জানান, ইহুদিবিদ্বেষী বা ইসলামবিদ্বেষী বক্তব্য প্রচারকারীদের ব্যাপারে সরকারের ‘শূন্য সহনশীলতা’ নীতি রয়েছে।
অন্যদিকে, সিডনিভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ডেইলি টেলিগ্রাফ-এর প্রতিবেদনে বলা হয়, অস্ট্রেলিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী টনি বার্কের দফতরে বিষয়টি অবহিত হওয়ার পরই দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হয়। প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, ২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রে দেওয়া এক বক্তব্যে আজহারীর বিরুদ্ধে ইহুদিবিরোধী মন্তব্য, ষড়যন্ত্র তত্ত্ব প্রচার ও বিতর্কিত বক্তব্যের অভিযোগ রয়েছে। এমনকি সিনেটর জোনাথান ডুনিয়াম সিনেটে দাবি করেন, অতীতে যুক্তরাজ্যেও তাকে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছিল।
তবে ভিসা বাতিলের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক প্রতিক্রিয়ায় আজহারী দাবি করেন, কিছু স্বার্থান্বেষী মহল তার পুরনো বক্তব্য প্রেক্ষাপটহীনভাবে উপস্থাপন করে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করেছে। তিনি বলেন, অস্ট্রেলিয়ায় তিনি কোনো বক্তব্য দেননি এবং তিনি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে বিশ্বাসী।
এদিকে আয়োজক সংগঠন আইপিডিসি আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন করে কোনো প্রতিক্রিয়া না জানালেও, এর আগে সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার মনির হোসাইন জানিয়েছিলেন যে, বিকল্প বক্তা দিয়ে সেমিনার চালিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা ছিল। তবে পরপর দুই বক্তার ভিসা বাতিল হওয়ায় পুরো আয়োজনই এখন অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
অস্ট্রেলিয়ায় বসবাসরত বাংলাদেশি কমিউনিটিতেও এ ঘটনায় মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। একাংশ হতাশা প্রকাশ করলেও, অন্য অংশ এটিকে দেশটির আইন ও নিরাপত্তা নীতির স্বাভাবিক প্রয়োগ হিসেবে দেখছেন।
প্রবাসী সংগঠন জালালাবাদ অ্যাসোসিয়েশন ইনক অস্ট্রেলিয়ার সদস্য ও কমিউনিটি ব্যক্তিত্ব শিপন আহমদসহ একাধিক নেতা বলেন, বিতর্কিত বক্তব্য ও বিভাজনমূলক মতাদর্শের কারণে এসব বক্তা দেশে-বিদেশে সমালোচিত। তারা মনে করেন, বহুসাংস্কৃতিক সমাজে এমন বক্তাদের আমন্ত্রণ দেওয়ার ক্ষেত্রে আয়োজকদের আরও দায়িত্বশীল হওয়া উচিত এবং ভবিষ্যতে কমিউনিটির ভাবমূর্তি ও অস্ট্রেলিয়ার আইনকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন।